দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর তালিকা তৈরি করতে গিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) যে অর্থ ও সময় ব্যয় করেছে, তা যেন মহাকাব্যকেও হার মানায়। যে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে সংশ্নিষ্ট বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য ও তালিকা। সেদিক থেকে ২০১৩ সালে সূচিত ‘ন্যাশনাল হাউজহোল্ড ডাটা’ (এনএইচডি) প্রকল্পটি সময়ের বিবেচনায় বিলম্বিত হলেও সঠিক পদক্ষেপ ছিল। বস্তুত আমাদের বিবেচনায় এ ধরনের তথ্যব্যাংক প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সময়েই গড়ে তোলা উচিত ছিল। তাহলে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি হয়তো আরও সুনির্দিষ্ট, গতিশীল ও সফল হতে পারত। যদিও ‘একেবারে না হওয়ার চেয়ে বিলম্বে হওয়া ভালো’ আপ্তবাক্য মেনে আমরা এ কর্মসূচিকে সাধুবাদ জানাতে পারতাম। কিন্তু শনিবার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনসূত্রে দেখা যাচ্ছে, সাত বছর পার করেও তালিকাটি এখনও সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। জনপ্রিয় বাংলা সংগীতে আক্ষেপ রয়েছে- ‘নাতি-খাতি বেলা গেল শুতি পারলাম না’। এই তালিকার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, সংশ্নিষ্টরা স্নানাহারেই সাত বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। আসল কাজ পড়েই রয়েছে। শুধু দীর্ঘসূত্রতা নয়, খরচের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। প্রকল্পটিতে ইতোমধ্যে ব্যয় বেড়েছে অন্তত চার গুণ।

এই তালিকা তৈরির ব্যয় কতটা অস্বাভাবিক, তা প্রমাণ হয় বিবিএস থেকে পরিচালিত অন্যান্য শুমারির ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করলে। যেখানে ২০১১ সালের আদমশুমারি, ২০১৩ সালের অর্থনৈতিক শুমারি এবং ২০০৮ ও ২০১৭ সালের কৃষিশুমারি- চার প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে কমবেশি ৭০০ কোটি টাকা; সেখানে এনএইচডি প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে সাতশ কোটি টাকায়। আমরা আশঙ্কা করি, এর ব্যয় আরও বাড়বে। বাকি চারটি শুমারি যদিও বিবিএস থেকেই পরিচালিত হয়; দরিদ্রশুমারির কাজ ‘আউটসোর্সিং’ করার উদ্দেশ্যই বা কী? দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এত ‘ব্যয়বহুল’ তালিকা করতে গিয়ে রাষ্ট্রের যে অর্থ খরচ হয়েছে, তা পরোক্ষভাবে দারিদ্র্য বৃদ্ধিতেই কি ভূমিকা রাখেনি? কাজটি যদি সময়মতো সম্পন্ন হতো, তাহলেও না হয় খানিকটা সান্ত্বতনা পাওয়া যেত। এই আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না যে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়াতেই এমন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন সংশ্নিষ্টরা। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প বরাদ্দ ও বাস্তবায়নে কোথাও অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে কিনা; হয়ে থাকলে কাদের স্বার্থে; বিলম্বে হলেও তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

যদি ‘বেনিফিট অব ডাউট’ দেওয়াও যায়, রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি ও বরাদ্দ নিয়ে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের এমন ঔদাসীন্য বা অবহেলা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। এ ধরনের তালিকার অভাবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে যে বিঘ্ন দেখা দেয়, তালিকা তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্তরা তার দায়ও এড়াতে পারেন না। আমাদের মনে আছে, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত বছর জুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে সহায়তার ঘোষণা দিয়েছিলেন; ত্রুটিপূর্ণ তথ্যের কারণে সেই তালিকা থেকে ১৫ লাখ নামই বাদ দিতে হয়েছিল। আমরা দেখতে চাই, দায়ীদের জবাবদিহির পাশাপাশি দরিদ্রদের তালিকাটিও অবিলম্বে সম্পন্ন করা হয়েছে। স্বীকার করতেই হবে, দেশে দারিদ্র্য বিমোচনে গত এক দশকে সরকারের অব্যাহত সাফল্যের বিষয়টিও বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। করোনাকালে যদিও খানিকটা থমকে দাঁড়িয়েছে; আগের বছরগুলোতে বৈশ্বিক বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকে বাংলাদেশ ক্রমাগত অগ্রগতি লাভ করে এসেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সুশাসনের ঘাটতিসহ নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ায় সামাজিক বিভিন্ন সূচকে গত দুই-তিন দশকে বাংলাদেশ যে ক্রমাগত এগিয়ে গেছে- এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা অনেকবার বলেছি। বিশেষত গত এক দশকে দারিদ্র্য বিমোচনে ধারাবাহিকভাবে উন্নতি একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। বর্তমান সরকার টানা তিন মেয়াদে যেভাবে দেশের অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক বেষ্টনীমূলক কর্মসূচির আওতা বাড়িয়েছে; যেভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়নে সর্বাত্মক মনোযোগী হয়েছে; তাতে দারিদ্র্য বিমোচনে সাফল্য অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু খোদ দরিদ্রদের তালিকা নিয়ে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা যেন লাভের গুড় পিঁপড়েয় খাওয়ার সমতুল্য।